বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে ওপরের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির
জন্য বিদ্যমান লটারি পদ্ধতি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন সরকার। আগামী
শিক্ষাবর্ষ (২০২৭ সাল) থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই সিদ্ধান্তের
কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এর ফলে প্রত্যাশিত বিদ্যালয়ে
ভর্তি হওয়ার জন্য শিশুদের আবারও সেই পুরোনো ভর্তির যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে।
বাংলাদেশে
বিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। বিশেষ করে নামী বা
ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র
প্রতিযোগিতা দেখা যায়। একসময় অধিকাংশ বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী
নির্বাচন করা হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার অনেক ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষার
পরিবর্তে লটারি পদ্ধতি চালু করেছে। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এই দুই পদ্ধতির মধ্যে কোনটি
শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি ন্যায়সঙ্গত ও যুগোপযোগী?
ভর্তি
পরীক্ষার পক্ষে যুক্তি
ভর্তি পরীক্ষার
মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করলে তাদের মেধা ও প্রস্তুতি যাচাই করা সম্ভব হয়।
অনেকের মতে, এতে একটি মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতা তৈরি হয় এবং যোগ্য
শিক্ষার্থীরা সুযোগ পায়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন
জানিয়েছেন, সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তিতে লটারি পদ্ধতির পরিবর্তে আবার
ভর্তি পরীক্ষা চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, বিদ্যমান
লটারি পদ্ধতি নিয়ে অনেক অভিভাবকের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। অনেকেই এটিকে একটি ‘ব্ল্যাক
বক্স’ পদ্ধতি হিসেবে দেখেন, কারণ আবেদন ও নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সবার
কাছে পরিষ্কার ধারণা থাকে না।
তিনি আরও বলেন,
পরীক্ষাভিত্তিক ভর্তিপদ্ধতি চালু হলে শিক্ষার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা
ও প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে, পাশাপাশি মেধা মূল্যায়নের একটি কাঠামো তৈরি হবে।
এদিকে বিষয়টি
জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন
জানিয়েছেন, আগের সরকার শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি ব্যবস্থা চালু করেছিল।
তবে আগামী শিক্ষাবর্ষে ভর্তির পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে
সবার মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভর্তি
পরীক্ষার বিপক্ষে উদ্বেগ
তবে শিক্ষাবিদ
ও শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ মনে করেন, আবার ভর্তি পরীক্ষা চালু করা
হলে পুরোনো সমস্যাগুলো ফিরে আসতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয়
মানসিক চাপ তৈরি হবে এবং কোচিং ও প্রাইভেট নির্ভরতা বাড়বে। এতে
শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যও বৃদ্ধি পেতে পারে।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন মনে করেন,
প্রাথমিক স্তরে কোনোভাবেই ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, ভর্তি পরীক্ষা
মানেই কোচিং বাণিজ্যের প্রসার এবং অল্প বয়সে শিশুদের অযথা প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে
দেওয়া। এতে শিশুর মেধা যাচাইয়ের নামে তাকে ‘পারে’ বা ‘পারে না’—এমন একটি মানসিক ট্যাগ দেওয়া হয়, যা
শিশুর জন্য ট্রমার কারণ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন,
সরকার যদি প্রতিটি বিদ্যালয়কে সমমানের বা কাছাকাছি মানের করে গড়ে তুলতে
পারে, তাহলে আলাদা করে লটারি বা ভর্তি পরীক্ষার প্রয়োজনই থাকবে না। নিজ নিজ এলাকার
বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিশ্চিত করা হলে শহরে যানজট কমবে এবং কমিউনিটিভিত্তিক
সামাজিক সম্পর্কও শক্তিশালী হবে।
একই ধরনের
মতামত দিয়েছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। তাঁর
মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা, কারণ এতে মূলত
কোচিং বা প্রাইভেট পড়া শিক্ষার্থীরাই এগিয়ে থাকে। তিনি মনে করেন, বর্তমান
পরিস্থিতিতে শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতিই তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য,
তবে সেটি অবশ্যই স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে পরিচালনা করা জরুরি।
লটারি
পদ্ধতির সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
লটারি পদ্ধতিতে
কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ভাগ্যের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হয়। এতে শিশুদের ওপর
অতিরিক্ত মানসিক চাপ থাকে না এবং কোচিং বা অতিরিক্ত প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে না।
ফলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের শিক্ষার্থীরাও সমান সুযোগ পেতে পারে।
তবে সমালোচকদের
মতে, লটারি পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মেধা বা প্রস্তুতির কোনো মূল্যায়ন হয় না। ফলে
অনেক সময় মেধাবী শিক্ষার্থীরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
কোনটি
বেশি যুগোপযোগী?
শিক্ষাবিদদের
মতে, অল্প বয়সে শিশুদের মেধার পার্থক্য খুব বেশি থাকে না। তাই এই বয়সে
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নেওয়া শিক্ষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও খুব একটা যৌক্তিক
নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই শিশুদের নিজ নিজ এলাকার বিদ্যালয়ে ভর্তি করার নীতি অনুসরণ
করা হয়, যেখানে অল্প বয়সে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে না।
শেষ
কথা
সব দিক বিবেচনা
করলে বলা যায়, বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এমন একটি পদ্ধতি প্রয়োজন যা একদিকে
শিক্ষার্থীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করবে না, আবার অন্যদিকে শিক্ষার সুযোগ
বণ্টনে ন্যায্যতাও নিশ্চিত করবে। তাই শিক্ষাবিদদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
হলো প্রতিটি এলাকায় মানসম্মত বিদ্যালয় গড়ে তোলা এবং শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত
করা। তখন ভর্তি নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা বা বিতর্ক—দুটিই অনেকাংশে কমে আসবে।

0 Comments